জ্বালানির মজুদে তীব্র চাপ, আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টায় সরকার

দেশে জ্বালানি তেল ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩১০ টন। জ্বালানি তেল নিয়ে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে গতকাল এ তথ্য জানায় জ্বালানি বিভাগ।

দেশে বর্তমানে প্রতিদিন তিনটি জ্বালানি পণ্যের গড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫ হাজার ৫৩১ টন (১-২৩ মার্চের গড় হিসাব অনুযায়ী)। মজুদ ও বিক্রির এ হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে পৌনে ১০ দিনের। যদিও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেলের জাহাজ আসায় এ হিসাব প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের প্রভাবে ছড়িয়ে পড়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ প্রথম বড় ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে পারে। গতকাল সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি তেল সংগ্রহে সরকার বিশ্বজুড়ে দৌড়ঝাঁপ করছে বলেও জানিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ।

দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ডিজেল। গতকাল জ্বালানি বিভাগের ডিজেলের মজুদের কথা জানিয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৩৯ টন। প্রতিদিন গড়ে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার ৭০০ টনের কিছু বেশি। বিক্রির এ হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে ১০ দিনের। যদিও গতকাল মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে দেশে ডিজেল এসেছে ৩৭ হাজার টন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশে আরো ৯৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে অকটেনের মজুদ ছিল ৭ হাজার ৯৪০ টন। প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টন। সেই হিসাবে দেশে অকটেনের মজুদ রয়েছে সাতদিনের। আর পেট্রলের মজুদ রয়েছে ১১ হাজার ৪৩১ টন। পণ্যটির প্রতিদিন গড় বিক্রি প্রায় দেড় হাজার টন। বিক্রি বিবেচনায় দেশে পেট্রলের মজুদ রয়েছে প্রায় আটদিনের।

দেশে জ্বালানি তেলের যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে তা সীমিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেল। ফলে চাহিদা বিবেচনায় যে পণ্যটির সবচেয়ে বেশি সরবরাহ দরকার সেটা বাড়াতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিজেল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এটি আমদানির বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ঘাটতি ধরে প্রস্তুতি নিতে হবে। কোনো খাতে সরবরাহ কমানোর আগে থেকেই অবহিত করতে হবে। সাশ্রয়ে নানা উদ্যোগ নিতে হবে। এটা বৈশ্বিক সংকট, উন্নত দেশও ভুগছে। কাউকে দায়ী করার সুযোগ নেই।’

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে তীব্র ভিড় কমানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করে কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। অবৈধ এ মজুদের প্রমাণও মিলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে।

দেশে জ্বালানি ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। যার বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলো। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ।

ঢাকায় টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি রেশনিং চললেও সরকার এখনো কার্যকর পরিকল্পনা দাঁড় করাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় এরই মধ্যে পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেয়া হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহন কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির মজুদ মাত্র ১০-২১ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, নতুন চালান আসার সম্ভাবনা থাকায় পুরোপুরি জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এখনই নিশ্চিত নয়। যদিও শিল্প খাতের সূত্রগুলো বলছে, কিছু অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট সরবরাহ আটকে রেখে সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ বাংলাদেশই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রথম বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ায় যায়, যার ওপর বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

তবে সংকট শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে ভারতের শিল্প উৎপাদন কমে গেছে। একই সময়ে ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া জনসাধারণের জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা বিবেচনা করছে। কিছু দেশ বাধ্য হয়ে চীনের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির জন্য আলোচনা শুরু করেছে, যেখানে বেইজিং এ সংকটকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যেও দুই সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।

টেলিগ্রাফ বলছে, বাংলাদেশ তার তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার দুই-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। চলতি মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানি করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মার্চের শেষদিকে রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা দিয়ে মাত্র ১৭ দিন চলা সম্ভব। ডিজেল ও পেট্রলের মজুদও একইভাবে সীমিত। ফলে নতুন জ্বালানি সংগ্রহে সরকার বিশ্বজুড়ে দৌড়ঝাঁপ করছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে দুই মাস অথবা ছয় লাখ টন ডিজেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ আটটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চালানো হচ্ছে।

এদিকে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ২ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল ও ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। গতকাল মঙ্গলবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এক্সন মোবিল কাজাখস্তান ইনকরপোরেশনের (ইএমকেআই) কাছ থেকে এক লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান পিটি বিএসপি জাপিনের কাছ থেকে ৬০ হাজার টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটসের কাছ থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে কমিটি।

এদিকে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার অস্থিতিশীল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ডিজেল-কেরোসিন-পেট্রল ও অকটেনের দাম আগের মতোই থাকছে। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক অফিস আদেশে সরকারের এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এপ্রিলে প্রতি লিটার ১০০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা, পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ আর অকটেনের দাম ১২০ টাকা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এ দামেই বিক্রি হয়েছে জ্বালানি তেল।

আরও